বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৩৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম:

সাতছড়ি-রেমা কালেঙ্গায় গাছ চুরি: ৬২ জনের বিরুদ্ধে মামলা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ২ বার পঠিত

স্টাফ রিপোর্টার: হবিগঞ্জের সীমান্তবর্তী সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা গাছ চুরি ও পাচারের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে একটি গোপনীয় তদন্ত প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে স্থানীয় বনদস্যু ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে মূল্যবান সেগুনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কাটার অভিযোগ করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর ৬২ জনের বিরুদ্ধে চুনারুঘাট থানায় পৃথক দুটি মামলা করেছে বন বিভাগ। বুধবার বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান। এর মধ্যে রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যের ডেপুটি রেঞ্জার এইচ এম এরশাদ ৪২ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা এবং সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ডেপুটি রেঞ্জার মোবারক হোসেন ২০ জনের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন।
এইচ এম এরশাদ জানান, মঙ্গলবারই চুনারুঘাট থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার পর বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। পরবর্তীতে বন অধিদপ্তর এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি গোপনীয় প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, জড়িত বনকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং চুনারুঘাট উপজেলায় গড়ে ওঠা অবৈধ করাতকল ও কাঠের ডিপো উচ্ছেদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে গত ২১ জুলাই সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ২৪৩ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে সাতছড়ি ও তেলমাছড়া বিট রয়েছে। দুর্গম এলাকা ও দুর্বল নজরদারির সুযোগে নিয়মিত গাছ চুরির ঘটনা ঘটছে। তদন্তে বন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশের অভিযোগও উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, চুনারুঘাট ও বাহুবল উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ৭৯৫ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যে রেমা, কালেঙ্গা, ছনবাড়ি ও রশিদপুর—এই চারটি বিট রয়েছে। সেখানে ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করলেও বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কাটার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে গাছ কাটা ও চুরির সঙ্গে জড়িত ১২ জন এবং রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যে ৩৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি গাছ কাটা ও পাচারে সহায়তার অভিযোগে বন বিভাগের পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামও রয়েছে। তাদের মধ্যে সাতছড়ি রেঞ্জের সাবেক বিট কর্মকর্তা মাসুনুর রশিদ ইতোমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া প্রতিবেদনে চুনারুঘাট উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক করিম সরকার, উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মারুফ মিয়া, যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শফিক মিয়া মহালদার, শ্রমিক দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর খান এবং মিরাশী ইউনিয়ন কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সোহাগসহ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার নামও এসেছে।
তবে অভিযুক্ত করিম সরকার, শফিক মিয়া ও জাহাঙ্গীর আলম এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। তবে কারা এই ষড়যন্ত্র করছে, সে বিষয়ে তারা কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বনাঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্কের দুর্বলতা, সন্ধ্যার পর মানুষের চলাচল কমে যাওয়া এবং দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিচ্ছে গাছ চোর চক্র। পাশাপাশি বনাঞ্চলের আশপাশে গড়ে ওঠা অবৈধ করাতকল ও কাঠের ডিপোগুলো চোরাই কাঠ প্রক্রিয়াজাত ও মজুদের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বন বিভাগের অভ্যন্তরের অসাধু ব্যক্তিদের সহযোগিতা ছাড়া এত বড় পরিসরে বন লুটপাট চালানো সম্ভব নয়। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বনাঞ্চল মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2019 Prothomsheba
Theme Developed BY ThemesBazar.Com